শেষ বাতিটি (বাংলা)
নদীর ধারে, যেখানে নদীটি রুপালি ফিতার মতো বাঁক নিয়েছে, সেখানেই ছিল একটি নীরব গ্রাম। গ্রামের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো বাতির খুঁটি। সময়ের সাথে এর রং খসে পড়েছিল, আর ঝড়-বৃষ্টিতে কাঁচে পড়েছিল অসংখ্য আঁচড়। প্রতিদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে, সূর্য গাছের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার সময়, বাতিটি মিটমিট করে জ্বলে উঠত এবং সরু পথটিকে সোনালি আলোয় ভরে দিত।
এই পথটিই সবাইকে বাড়ি ফিরিয়ে নিত।
গ্রামের মানুষ বাতিটির দিকে খুব একটা তাকাত না। তাদের কাছে এটি ছিল শুধু পুরোনো, দুর্বল এক জিনিস—যেটি একদিন বদলে ফেলা হবে। কিন্তু ছোট একটি ছেলে, আয়ান, বাতিটিকে অন্য চোখে দেখত।
কয়েক বছর আগে আয়ান তার বাবাকে হারিয়েছিল। সেই থেকে ভয় যেন তার ছায়া হয়ে সঙ্গী হয়েছিল। ঝড়ের রাতে, বাতাস যখন হু হু করে বইত, কিংবা জঙ্গল থেকে অদ্ভুত শব্দ আসত, আয়ান বাতিটির নিচে বসে পড়ত। হাঁটু জড়িয়ে ধরে সে তাকিয়ে থাকত সেই কাঁপতে থাকা আলোয়—যেটা কখনো নিভে যেত না। সেই আলো তাকে নিরাপদ মনে করাত।
তার দাদি পাশে বসে গল্প বলতেন।
তিনি বলতেন,
“অন্ধকার যত গভীর হয়, আলো তত শক্তিশালী হয়।”
এক সন্ধ্যায় আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে এলো। দূরে বজ্র গর্জন করছিল, নদী ফুলে উঠছিল। প্রবল বৃষ্টিতে গ্রামজুড়ে বিদ্যুৎ চলে গেল। একে একে ঘরগুলো অন্ধকারে ডুবে গেল। মানুষ ভয় পেতে শুরু করল।
কিন্তু পুরোনো বাতিটি তখনও জ্বলছিল।
বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে তার আলো স্থির ও সাহসী হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কেউ সন্তানদের হাত ধরল, কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটল। সবাই সেই আলো অনুসরণ করে নিরাপদে পথ খুঁজে নিল।
আয়ান বাতিটির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল—ভিজে, কিন্তু হাসিখুশি। সেদিন প্রথমবার সে ভয় পায়নি।
সকালে ঝড় থেমে গেল। আকাশ পরিষ্কার, নদী শান্ত। কিন্তু বাতিটি মাটিতে পড়ে ছিল—ভাঙা, কাঁচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আলো নিভে গেছে।
গ্রামবাসী নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারা বুঝল, তারা শুধু একটি বাতি হারায়নি—তারা হারাতে বসেছিল তার অনুভূতি।
তাই তারা সেই জায়গায় একটি গাছ লাগাল। তারা প্রতিজ্ঞা করল, অন্ধকারে একে অন্যের জন্য আলো হয়ে থাকবে। প্রয়োজনে হাতে হাতে বাতি জ্বালাবে।
বছর পেরিয়ে গেল। আয়ান বড় হয়ে শিক্ষক হয়ে গ্রামে ফিরল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় শিশুরা সেই গাছের নিচে খেলত। সেখানে আর কোনো বাতি ছিল না, তবুও পথটি সবসময় আলোকিত মনে হতো।
কারণ সত্যিকারের আলো কখনো নিভে যায় না।






